বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) খাইরুল আলম সুমনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলা প্রশাসককে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ভিডিও, ছবি ও বিভিন্ন ধরনের পোস্ট ছড়িয়ে একটি সংঘবদ্ধ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগসংক্রান্ত একটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সেটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শুরু হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বর্তমান জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমনের অন্যত্র বদলির কোনো কার্যকর সরকারি আদেশ জারি হয়নি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান কর্মকর্তার বদলির কার্যকর আদেশ পৃথক বিষয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত “ডিসি পালিয়ে গেছেন”, “বাধ্য হয়ে অফিস ছেড়েছেন” কিংবা “বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিয়েছেন”এ ধরনের দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দাপ্তরিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি বিভিন্ন মহলের চাপ ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এসব প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী শুরু থেকেই বিভিন্নভাবে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি সেই অপপ্রচার আরও সংগঠিত রূপ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে দায়িত্ব পালনের জন্য কিছু সাংবাদিকদের (পাস) প্রদানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, সেই ঘটনার জের ধরে একটি মহল বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে আসছে। সর্বশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ডিসি পালিয়েছে” বা “বিক্ষোভের মুখে অফিস ছেড়েছেন” এ ধরনের প্রচারণাকেও একই ধারাবাহিক অপপ্রচারের অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশেই যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ভিডিও ও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে, যা সমন্বিত প্রচারণার ইঙ্গিত দেয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি বদলি হওয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশের সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অপপ্রচারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানসহ প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
সচেতন মহলের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা শুধু ব্যক্তির সুনামই ক্ষুণ্ন করে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিও মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তারা বলেন, সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করাই দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়।