দ্যা এক্সপোস

সাংবাদিকতা কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়াবে, নাকি সত্যের ওপর?

সাংবাদিকতা কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়াবে, নাকি সত্যের ওপর?

বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি-সাংবাদিকতার পরিচয় কি হবে একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে, নাকি জনগণের আস্থাভাজন সংবাদকর্মী হিসেবে? প্রশ্নটি শুধু বরিশালের নয়, পুরো দেশের গণমাধ্যমের জন্যই প্রাসঙ্গিক। তবে মফস্বল সাংবাদিকতায় এর প্রভাব আরও গভীর।

সাংবাদিকের কাজ কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হয়ে ওঠা নয়। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি জনগণের প্রতিনিধি। তিনি জনগণের হয়ে প্রশ্ন করবেন, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখোমুখি করবেন এবং বিরোধী পক্ষের বক্তব্যও সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরবেন। কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিককে দিনের পর দিন রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরতে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত প্রচারক হয়ে উঠতে দেখা যায় কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিতে দেখা যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে; এটি কি সাংবাদিকতা, নাকি অন্য কোনো পেশা?

বরিশালে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই সাংবাদিকতাকে প্রভাব খাটানোর একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান। কেউ ঠিকাদারি করেন, কেউ ব্যবসা পরিচালনা করেন, কেউ আবার রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে সংবাদপত্রের পরিচয় ব্যবহার করেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত সাংবাদিকরা। কারণ সাধারণ মানুষ তখন সবাইকে একই চোখে দেখতে শুরু করেন।

প্রশ্ন হলো, সাংবাদিক কি ঠিকাদারি করবেন? আইন কোনো সাংবাদিককে ব্যবসা করতে নিষেধ না করলেও, বাস্তবতা হলো, যে ব্যক্তি সরকারি কাজের ঠিকাদার, তিনি একই সঙ্গে সেই কাজের দুর্নীতি নিয়ে নিরপেক্ষ সংবাদ কীভাবে করবেন? যার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তিনি কি স্বার্থের সংঘাত এড়াতে পারবেন? একইভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে সেই নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখা কি সম্ভব?

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না; বছরের পর বছর সততা, নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। অথচ সেটি নষ্ট হতে সময় লাগে মাত্র একটি ভুল সিদ্ধান্ত।

অনেকে মনে করেন সাংবাদিকতার আসল কৌশল (ট্রিকস) হলো মন্ত্রী, এমপি, মেয়র কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলা, সব অনুষ্ঠানে সামনে বসা বা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। বাস্তবে এটি সাংবাদিকতার ট্রিকস নয়; বরং অনেক সময় এটি স্বাধীনতাকে দুর্বল করে দেয়।

সাংবাদিকতার প্রকৃত কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রথমত, তথ্যের উৎস তৈরি করতে হবে। একজন দক্ষ সাংবাদিকের শক্তি তার পরিচিতির তালিকায় নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্যদাতার নেটওয়ার্কে। প্রশাসন, আদালত, হাসপাতাল, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য সূত্র গড়ে তুলতে পারলেই বড় সংবাদ বেরিয়ে আসে।

দ্বিতীয়ত, ডকুমেন্ট সংগ্রহের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগ নয়, প্রমাণই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। একটি সরকারি নথি, একটি দরপত্র, একটি তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা আদালতের কাগজ এসবই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রাণ।

তৃতীয়ত, প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। অনেকেই সংবাদ সম্মেলনে যান, কিন্তু প্রশ্ন করেন না। অথচ একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার প্রশ্ন। যে প্রশ্ন ক্ষমতাবানকে অস্বস্তিতে ফেলে, জনগণকে তথ্য দেয় এবং সত্যের পথ খুলে দেয়, সেটিই প্রকৃত সাংবাদিকতা।

চতুর্থত, সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া। কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি পেশাগত মানদণ্ডও। এতে সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে এবং পাঠকের আস্থা তৈরি হয়।

বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা আজ সময়ের দাবি। এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতে পারবে না। একজন নাগরিক হিসেবে সবার মত থাকতে পারে। কিন্তু সেই মত যেন সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ নির্বাচন কিংবা সংবাদ পরিবেশনে প্রভাব না ফেলে।

মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক নেতারা বদলান, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের পরিচয় যদি সত্য, সাহস ও নিরপেক্ষতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তিনি সব সময় সম্মানিত থাকেন। আর যদি পরিচয় গড়ে ওঠে ক্ষমতার ছায়ায়, তবে ক্ষমতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয়ও ম্লান হয়ে যায়।

বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে এখন একটি সুযোগ আছে—তারা কি রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হয়ে থাকবেন, নাকি জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবেন? ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেন সেই সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতার নয়, সত্যের পাশে দাঁড়ান। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ট্রিকস কোনো নেতা বা ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নয়; সবচেয়ে বড় ট্রিকস হলো; সত্যকে খুঁজে বের করার দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের ধৈর্য এবং কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করার সাহস।