দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বরিশাল। নদী, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, শিক্ষা ও যোগাযোগ সব দিক থেকেই এই অঞ্চলের সম্ভাবনা অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বরিশাল এখনও দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। পরিকল্পনার অভাব, বিনিয়োগ সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়ন কৌশলের ঘাটতি এ অঞ্চলের অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে।
আজ সময় এসেছে নতুনভাবে ভাবার। বরিশালকে শুধু একটি বিভাগীয় শহর নয়, বরং একটি আধুনিক অর্থনৈতিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে হবে বরিশাল সিটি করপোরেশনকে।
বরিশালের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর নদীপথ। কীর্তনখোলা নদীকে কেন্দ্র করে আধুনিক রিভারফ্রন্ট, পর্যটন জোন, জলভিত্তিক বিনোদন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে তোলা গেলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যান্য শহরের মতো বরিশালেও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের এখনই উপযুক্ত সময়। বরিশালের ধান, পেয়ারা, আমড়া, নারিকেল, সুপারি, মাছ ও সবজি শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে যদি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে স্থানীয় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং নতুন শিল্প উদ্যোক্তাও তৈরি হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থানও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও স্থানীয়ভাবে মানসম্মত চাকরির সুযোগ সীমিত। এজন্য তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার, ফ্রিল্যান্সিং হাব এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বরিশালের পর্যটন খাতও এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। নদী, চর, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন প্রাণ ফিরে আসবে।
এই বাস্তবতায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়রের প্রতি একটি বিনীত আহ্বান আপনি শুধু দৈনন্দিন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করেই থেমে থাকবেন না। বরং আগামী ২০ বছরের অর্থনৈতিক বরিশালের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করুন। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি “বরিশাল ইকোনমিক কাউন্সিল” গঠন করা যেতে পারে। এই কাউন্সিল শহরের সম্ভাবনা চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে।
একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি “ইনভেস্ট ইন বরিশাল” উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শহরের সম্ভাব্য শিল্প এলাকা, পর্যটন প্রকল্প, আইটি খাত এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ একটি বিনিয়োগ নির্দেশিকা প্রকাশ করা হলে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
বরিশাল শুধু অতীতের ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকার শহর নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনার শহর। প্রয়োজন শুধু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, স্বচ্ছ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আজ যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলা যায়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যেই বরিশাল দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বরিশালের মানুষ উন্নয়ন চায়, কর্মসংস্থান চায়, বিনিয়োগ চায়। এখন প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্তের। সেই নেতৃত্ব দেওয়ার একটি বড় সুযোগ রয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়রের হাতে। ইতিহাস সাক্ষী যে শহর পরিকল্পনা করে, সেই শহরই একদিন সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠে।